ArticlesUncategorized

অ্যান্ড্রু কার্নেগি: মানবতার সেবায় নিয়োজিত এক অন্যরকম উদ্যোক্তার গল্প

0

১৯ শতকের ধনী স্টিল ব্যবসায়ীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন অ্যান্ড্রু কার্নেগি। অসাধারণ এই ব্যক্তি জীবনের অনেকটা সময় মানবপ্রেমে উৎসর্গ করেছিলেন। সাধারণ ভাবে অসাধারণ মানবপ্রেমী মহান মানুষটিকে নিয়ে জানার চেষ্টা করবো আজকের আলোচনায়।

শুরুর আগে

স্কটল্যান্ডের ডেনফার্মলিনে ১৮৩৫ সালের ২৫ নভেম্বর অ্যান্ড্রু কার্নেগি জন্মগ্রহণ করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাওয়ার পরে, তিনি রেলওয়েতে চাকরি নিয়েছিলেন। ১৮৮২ সাল পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে বড় কার্নেগি স্টিল কর্পোরেশনের মানলিকানা ছিল অ্যান্ড্রু কার্নেগির নিয়ন্ত্রণে। তিনি স্টিল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিক্রি করেন ১৯০১ সালে এবং ১৯০৪ সালে কার্নেগি-মেলন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম শুরু করেন।

source: images.google.com

প্রারম্ভিক জীবন

শিল্পপতি এবং মানবপ্রেমী কার্নেগির শিক্ষাগত যগ্যতা খুব বেশি না থাকলেও তিনি এমন এক পরিবারে বড় হয়েছিলেন, যে পারিবার গঠনমূলক শিক্ষাকে গুরুত্বের সাথে দেখতেন। গঠনমূলক শিক্ষার ফলে হ্যান্ডলুম উইভারের পুত্র, কার্নেগি কম শিক্ষা নিয়েও আমেরিকার সফল ধনী ব্যবসায়ীদের মধ্যে একজন হয়ে ওঠেন। ১৩ বছর বয়সে, ১৮৪৮ সালে, কার্নেগি পরিবারের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন। এসময় তারা পেনসিলভানিয়ার স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। কার্নেগি তখন একটি ফ্যাক্টরিতে কাজ করার মাধ্যমে প্রতি সপ্তাহে ১২০ ডলার আয় করতেন।

source: images.google.com

পরের বছর তিনি টেলিগ্রাফ বার্তাবাহক হিসেবে একটি চাকরি পান এবং ‍১৮৫১ সালে ভালো কাজের জন্য তিনি টেলিগ্রাফ অপারেটর পদে উন্নীত হন। এরপর ১৮৫৩ সালে পেনসিলভানিয়া রেলপথে চাকরি পান। পরবর্তীতে তিনি রেলওয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে একজন হয়ে উঠেন। এই অভিজ্ঞতার মাধ্যমে, তিনি রেলওয়ে শিল্প সম্পর্কে এবং সাধারণ সব ব্যবসা সম্পর্কে অনেক দক্ষতা অর্জন করেন। এর ঠিক তিন বছর পরে তাকে রেলওয়ের নিয়ন্ত্রক পদে উন্নীত করা হয়।

স্টিল কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠা

রেলপথে কাজ করার সময় থেকেই কার্নেগি বিনিয়োগ শুরু করেন। অভিজ্ঞ কার্নেগি বিচক্ষণতার সাথে খেয়াল করেছিলেন তার বিনিয়োগগুলো বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য মুনাফা নিয়ে আসছে। এজন্য  ১৮৬৫ সালে ব্যবসায়িক স্বার্থে তিনি রেলপথের চাকরি ত্যাগ করেন। পরের দশকগুলোতে তিনি বেশির ভাগ সময় ব্যয় করেন ইস্পাত শিল্পের উন্নয়নের জন্য। পরবর্তীতে তার নিজস্ব ব্যবসা কার্নেগি স্টিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টিল উৎপাদনে ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসেন।

source: images.google.com

কার্নেগি স্টিলে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উন্নত পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে ইস্পাত তৈরি ছিল সহজ এবং দ্রুত উৎপাদনশীল। এজন্য তিনি প্রতিটি ধাপে ধাপে নির্ধারিত কিছু কৌশল প্রয়োগ করতেন যেমন ইস্পাত শিল্পে কাঁচামাল, পরিবহনের জন্য রেলপথ অথবা জাহাজ এমনকি জ্বালানীর জন্য কয়লা সহ প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিটি জিনিস তার নির্ধারণ করা থাকতো যাতে উৎপাদনে ব্যাঘাত না ঘটে।

এই কৌশলগুলো অ্যান্ড্রু কার্নেগিকে ব্যবসা ক্ষেত্রে প্রভাবশালী এবং ধনবান ব্যক্তিতে পরিণত করতে সাহায্য করেছিল। স্টিল ব্যবসার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে অনেক বড় ভূমিকা রাখায় তিনি ‘বিল্ডার্স’ নামে পরিচিতি লাভ করেন যা সত্যিই বর্তমান সময়ের উদ্যোক্তদের নানাভাবে অনু্প্রাণিত করে। এরই ধারাবাহিকতায় কার্নেগি স্টিল ১৮৮৯ সালে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ স্টিল প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি অর্জন করে।

source: images.google.com

কেউ কেউ মনে করেন, কার্নেগি স্টিলের সাফল্য দক্ষ শ্রমিকদের হাত ধরেই এসেছিল। কারণ ১৮৯২ সালে শ্রমিকদের পারিশ্রমিক কমানোর কথা উঠলে শ্রমিকরা আন্দোলনে নেমে পড়ে যা ছিল কার্নেগি স্টিল কর্পোরেশনের উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম। তৎকালে এটি হোমস্টেড ধর্মঘট নামে পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তীতে এই ধর্মঘট বড় আকার ধারণ করে কিন্তু মজার বিষয় হলো ধর্মঘটের সময় কার্নেগির অবস্থান ছিল খুবই অস্বাভাবিক। এজন্যই এ পরিস্থিতির জন্য অনেকে তাকে দায়ী করেন কেননা একজন পরিচালক হিসাবে কার্নেগির এরকম সিন্ধান্ত নেওয়া কোনোভাবেই উচিত ছিল না।

মানবপ্রীতি

বিভিন্ন লাইব্রেরি নির্মাণ এবং লাইব্রেরিতে দান করার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী কাজ শুরু করলেও তিনি ২০ শতাব্দীর শুরুতে দানশীলতার এই কার্যক্রমকে আরও বিস্তৃত করেছিলেন। ১৯০১ সালে কার্নেগি তার জীবনে একটি নাটকীয় ঘটনার জন্ম দিয়েছিলেন কারণ হঠাৎ করেই তিনি তার স্টিল ব্যবসা যুক্তরাষ্ট্রের স্টিল কর্পোরেশনে প্রায় ২০০ মিলিয়নের বেশি ডলারে বিক্রি করেন। সফল এই ব্যবসায়ী ৬৫ বছর বয়সে সিন্ধান্ত নেন বাকি দিনগুলো অন্যদের সাহায্য করার জন্য ব্যয় করবেন।

source: images.google.com

বই পাগল কার্নেগি ১৯০১ সালে নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরিতে প্রায় ৫ মিলিয়ন ডলার দান করেন যাতে লাইব্রেরিটি বিভিন্ন শাখা খুলতে পারে। শিক্ষার জন্য নিবেদিত প্রাণ কার্নেগি, পিটসবার্গে কার্নেগি ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি প্রতিষ্ঠা করেন যা বর্তমানে কার্নেগি-মেলন বিশ্ববিদ্যালয় (Carnegie-Mellon University) নামে পরিচিত।

১৯০৫ সালে শিক্ষা ক্ষেত্রে অগ্রগতির জন্য কার্নেগি ফাউন্ডেশন তৈরি করেন। আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষার জন্য ১৯১০ সালে তিনি কার্নেগি এনডাওমেন্ট নামক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন যা সারা বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য এখনো কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়াও তিনি লাইব্রেরি নির্মাণে এত বেশি দান করেছেন যে, বলা হয়ে থাকে তার অর্থায়নে প্রায় ২৮০০ এরও বেশি লাইব্রেরি খোলা হয়েছিল।

source: images.google.com

ব্যবসা এবং দাতব্য কার্যক্রম ছাড়াও কার্নেগি ঘুরে বেড়াতে অনেক ভালোবাসতেন। তিনি ম্যাথিউ আরনল্ড, মার্ক টোয়েন, উইলিয়াম গ্ল্যাডস্টোন, এবং থিওডোর রুজভেল্টের মতো প্রমুখ ব্যক্তিবর্গের বন্ধু ছিলেন। এছাড়াও তিনি বেশ কয়েকটি বই এবং অসংখ্য নিবন্ধ লিখেছিলেন। ১৮৮৯ সালে প্রকাশিত ‘সম্পদ’ নিবন্ধের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন বিত্তশালী ব্যক্তিরা কিভাবে তাদের সম্পদকে সামাজিকভাবে অন্যদের সাহায্য করার জন্য ব্যবহার করতে পারে।

মৃত্যু

সফল ব্যবসায়ী, দানশীল, মানবপ্রেমী এই মানুষটি ১৯১৯ সালের ১১ আগস্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লেনক্সে মৃত্যুবরণ করেন।

বিশ্ববিখ্যাত কম্পিউটার নির্মাণকারী কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা মাইকেল ডেল এর জীবনের গল্প

Previous article

উনবিংশ শতাব্দীর সফল উদ্যোক্তা জে পি মর্গানের জীবনের গল্প

Next article

You may also like

Comments

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More in Articles