ArticlesUncategorized

ল্যারি পেজ: গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা হয়ে ওঠার গল্প

0

Always deliver more than expected” অর্থাৎ সবসময় চেষ্টা করুন প্রত্যাশার চেয়েও বেশি কিছু দিতে। অসাধারণ এই কথাটি বলেছেন প্রযুক্তির প্রাণকেন্দ্র খ্যাত গুগলের প্রাক্তন প্রধান নির্বাহী এবং সহপ্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ। প্রযুক্তিতে অসামান্য অবদান রাখা এই মহানায়কের জীবনের গল্প শোনাবো আজ।

কে এই ল্যারি পেজ?

যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান শহরে ২৬ মার্চ ‍‍১৯৭৩ সালে ল্যারি পেজ জন্মগ্রহণ করেন। যার পুরো নাম লরেন্স এডওয়ার্ড পেজ। বলতে গেলে জন্মগতভাবেই ল্যারি পেজ প্রযুক্তির সাথে বড় হয়েছেন। কারণ তার বাবা-মা দু’জনই ছিলেন কম্পিউটার প্রকৌশলী। এজন্যই খুব স্বাভাবিকভাবে “যেমন পিতা তেমন পুত্র” প্রচলিত এই বাক্যের মতো তিনি স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার প্রকৌশলে উচ্চতর পড়াশোনা শুরু করেছিলেন। যদিও শেষ পর্যন্ত তিনি আর স্ট্যানফোর্ডে উচ্চতর ডিগ্রি নিতে পারেননি।

Source: Time

সহজবোধ্যভাবে আমরা যেটাকে বলি ড্রপআউট। মূলত স্ট্যানফোর্ডে অধ্যায়নকালে ল্যারির সাথে পরিচয় হয় সের্গেই ব্রিনের (Sergey Brin)। পরবর্তীতে সৃজনশীলতায় পরিপূর্ণ মেধাবী এ দুই বন্ধু মিলে ১৯৯৮ সালে জাতীর কাছে উপহার দেন বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় সার্চ ইঞ্জিন গুগল।

প্রারম্ভিক জীবন এবং ক্যারিয়ার

যুক্তরাষ্ট্রের মোটামুটি জনবহুল একটি শহর মিশিগান। এ শহরেরই ল্যারি পেজ বড় হয়েছেন প্রযুক্তিবীদ বাবা-মায়ের সাথে থেকে। কেননা তখনকার সময়েই তার বাবা কার্ল পেজের কম্পিউটার প্রকৌশল এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে ছিল অসামান্য অবদান। অন্যদিকে ল্যারির মা ছিলেন একজন সুদক্ষ কম্পিউটার প্রোগ্রামার। এরকম গঠনমূলক আধুনিক মেধাবী প্রকৌশল পরিবারে এবং পরিবেশে বড় হওয়ার ফলে ছোটবেলা থেকে ল্যারি পেজ কম্পিউটারের প্রেমে পড়ে যান। এছাড়াও একই সাথে তার আগ্রহ ছিল নতুন নতুন প্রযুক্তি, ব্যবসা এবং নানাবিধ উদ্ভাবনের প্রতি।

Source: Quartz

এজন্যই হয়তো, ল্যারি পেজ ১২ বছর বয়সেই উপলবদ্ধি করতে পেরেছিলেন তিনি ভবিষ্যতে একজন সফল উদ্যোক্তা হবেন। তিনি ১৯৯১ সালে ইস্ট ল্যান্সিং উচ্চ বিদ্যালয় থেকে স্কুল জীবন শেষ করেন এবং মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার প্রকৌশলে ব্যাচেলর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে তরুণ মেধাবী এই শিক্ষার্থী কম্পিউটার প্রকৌশলে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের জন্য পাড়ি জমান স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে সের্গেই ব্রিনের সাথে পরিচয়ের পরই মূলত তার সম্পূর্ণ জীবন পাল্টে যায়।

source: Fortune

মেধাবী এই তরুণদের উদ্ভাবনী কল্যাণে ১৯৯৮ সালে প্রযুক্তিক বিপ্লব ঘটে গুগল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। তারা উভয়েই ২০০১ সাল পর্যন্ত সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরবর্তীতে এরিক স্মিটকে (Eric Schmid) গুগলের চেয়ারম্যান ও সিইও হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০১১ সালে ল্যারি পুনরায় প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং এরিক স্মিট নির্বাহী চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।

বর্তমানে ল্যারি পেজ গুগলের পরিচালনা পরিসদের সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও তিনি নবায়নযোগ্য শক্তি, প্রযুক্তির ভারসাম্য এবং মানবপ্রেমের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সময় কাটাতে ভালোবাসেন। এজন্য ২০০৪ সালে তিনি Google.org প্রতিষ্ঠা করেন যা জলবায়ু পরিবর্তন এবং নবায়নযোগ্য শক্তির সাথে সম্পর্কিত।

গুগল প্রতিষ্ঠা এবং এর অগ্রগতি

১৯৯৫ সালে স্ট্যানফোর্ডে সহ গবেষক পদে দায়িত্বে থাকা অবস্থায় সের্গেই ব্রিনের সাথে একটি রিসার্চ প্রজেক্টে পরিচয় হয় ল্যারি পেজের। ঠিক এর পরের বছরেই তারা সার্চ ইঞ্জিন তৈরি করেন যার প্রাথমিক নাম দেওয়া হয় ব্যাকরুব (BackRub)। পরবর্তীতে এই সার্চ ইঞ্জিন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সার্ভারে বেশ কয়েকমাস চালু ছিল।

Source: India TV

স্ট্যানফোর্ডের এই প্রজেক্ট সফলভাবে শেষ হওয়ার পরেই ল্যারি এবং ব্রিন দলীয়ভাবে সম্পূর্ণ নতুন উদ্ভাবনী ভাবনা নিয়ে তাদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান খোলার সিন্ধান্ত নেন। কিন্তু নবগঠিত একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক উন্নতির জন্য আর্থিক সহায়তা অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ন একটি বিষয়। তাদের এই অভিনব সৃজনশীল উদ্ভাবনী পরিকল্পনায় অনুপ্রাণিত হয়ে তখনকার সময়ের জনপ্রিয় প্রযুক্তিক প্রতিষ্ঠান সান মাইক্রোসিস্টেমের সহপ্রতিষ্ঠাতা অ্যান্ডি বেচোলসহিম (Andy Bechtolsheim) প্রায় ১ লক্ষ্য ডলার আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৮ সালের সেপ্টেম্বরে তাদের নিজস্ব প্রজেক্ট তথা কোম্পানি গুগল পৃথিবীর আলো দেখার সামর্থ্য লাভ করে।

Source: Quartz

২০০৫ সাল ছিল গুগলের ইতিহাসে স্মরণকালের সবচেয়ে কার্যকারী একটা সময়। এ বছর গুগল – গুগল ম্যাপ, ব্লগার মোবাইল, গুগল রিডার, আই গুগল বাজারে নিয়ে আসে। এর পরের বছরই গুগল ইউটিউবকে কিনে নেয় এবং একইসময়ে জিমেইলে তথ্য আদান প্রদানের বিষয়ে অনেক তথ্য প্রকাশ করে। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে গুগল চায়না মোবাইলের সাথে একটি অংশীদারিত্বে চলে যায় যা গুগল অ্যাপস এবং সম্পূর্ণ ফ্রি পড়াশোনা বিষয়ক কাজের জন্য ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল।

২০০৮ সালে গুগল আর্থ নামের নতুন একটি ফিচার সংযোজন করে। পরবর্তীতে গুগল ছোট বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক সহায়তার জন্য একটি ভেনচার ক্যাপিটাল ফান্ড খোলার সিন্ধান্ত নেয়। এভাবেই প্রতিবছর গুগল নিত্যনতুন প্রযুক্তির নানাবিধ উন্নতির ফলে প্রযুক্তিকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়।

পুরস্কার এবং অর্জনসমূহ

২০০২ সালে, ৩৫ বছর বয়সের মধ্যে বিশ্বের শীর্ষ ১০০ উদ্ভাবকগণের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য ল্যারি এবং ব্রিনকে এমআইটি টেকনোলজি রিভিউ টিআর১০০-এ নামকরণ করা হয়। এছাড়াও ২০০২ সালে ল্যারি বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে গ্লোবাল লিডার ফর টুমোরো নির্বাচিত হোন। পরবর্তীতে ল্যারি এবং ব্রিন ২০০৪ সালে সম্মানিত মার্কোনি ফাউন্ডেশন পুরস্কার লাভ করেন যা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য দেওয়া হয়। এছাড়াও তিনি কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে মারকোনি ফাউন্ডেশনের ফেলোও নির্বাচিত হয়েছিলেন।

ব্যক্তিগত জীবন

ব্যক্তিগত জীবনে ল্যারি পেজ লুসিন্ড সাউথউইথ নামক এক রমনীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হোন ২০০৭ সালে। পেশাগত ভাবে পেজের স্ত্রী একজন বিজ্ঞানী এবং গবেষক। প্রভাবশালী প্রযুক্তিক এই দম্পতির সন্তান মাত্র একটি।

সম্পদ

উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী ল্যারি পেজের বর্তমান সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৫৩.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

মজার তথ্য

১৯৯৩ সালে কম্পিউটার প্রকৌশলে অধ্যায়নকালে তিনি মাইস এবং ব্লু সোলার কারের টিমের সাথে যুক্ত ছিলেন এবং তখন থেকেই তিনি বৈদ্যুতিক গাড়ী টেসলা মোটর প্রস্তুতকারকের একজন সক্রিয় বিনিয়োগকারী হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন।

শেষের শুরু‌

এ অংশে আমরা ল্যারি পেজের জীবন থেকে কিছু সুচিন্তিত অনুপ্রেরণা নেওয়ার চেষ্টা করব। উপরের কথাগুলো ভালো মতো উপলবদ্ধি করলে দেখবেন দুটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত প্রযুক্তির সৎ এবং উপযুক্ত ব্যবহার। দ্বিতীয়ত গঠনমূলক সৃজনশীল চিন্তাশক্তি। তাহলে এক কথায় বিষয়টি দাঁড়াচ্ছে, কেবলমাত্র বা একমাত্র প্রযুক্তি এবং গঠনমূলক চিন্তাশক্তির মেলবন্ধেই পারে আপনার আমার প্রযুক্তিতে সুনিশ্চিত ক্যারিয়ার গড়তে।

বিশ্বের শীর্ষ ধনী এবং অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসের জীবনের অসাধারণ কিছু গল্প

Previous article

ডেভিড সারনফ: ফাদার অব ব্রডকাস্টিং

Next article

You may also like

Comments

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More in Articles