ArticlesUncategorized

উনবিংশ শতাব্দীর সফল উদ্যোক্তা জে পি মর্গানের জীবনের গল্প

0

জে পি মর্গান ১৮০০ সালের শেষের দিকে ব্যক্তিগত তথা মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর প্রতিষ্ঠা এবং শিল্প একত্রীকরণের মাধ্যমে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী এবং শক্তিশালী ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তৎকালীন প্রভাবশালী এই উদ্যোক্তা সম্পর্কে থাকছে আজকের আলোচনায়।

জে পি মর্গানের পুরো নাম জন পিয়ারপন্ট মর্গান। তিনি ১৭ এপ্রিল, ১৮৩৭ সালে প্রখ্যাত নিউ ইংল্যান্ড পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৮৫০ সালে তিনি নিউইয়র্কের অর্থনৈতিক শিল্পে পদার্পণের মাধ্যমে পেশাগত জীবন শুরু করেন এবং নিজস্ব অর্থায়নে ১৮৭১ সালে ব্যাংকিং ফার্ম প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৮০ সালে তিনি রেললাইন শিল্পেও ক্ষমতাবান ব্যবসায়ী হয়ে ওঠেন। জে পি মরগানের ২১ শতকের ব্যবসায়িক কৌশল পুরো অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে এসেছিল। সফল এই ব্যবসায়ী ১৯১৩ সালে রোমে মৃত্যুবরণ করেন।

source: images.google.com

প্রাথমিক জীবন

জে পি মর্গানের পিতামহ আইটিনা ইন্সুরেন্স কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তার পিতা জুনিয়াস তৎকালের সুপরিচিত জননেতা জন পিয়ারপন্টের কন্যা জুলিয়েট পিয়ারপন্টকে বিয়ে করার পর ব্যবসা সম্পর্কে বিস্তর জ্ঞান অর্জন করেন। ছোটবেলা থেকে মর্গান দুর্বল এবং অসুস্থ ছিলেন। একটু সুস্থ হলেই তিনি পিতামহের সাথে ঘোরাঘুরি করতেন। প্রাথমিকভাবে জে পি মর্গান বুদ্ধিমান এবং গতানুগতিক ছাত্র ছিলেন পাশাপাশি বোস্টনের স্বনামধন্য ইংরেজি হাই স্কুলে পড়াশোনা করতেন।

source: images.google.com

১৮৫৪ সালে জুনিয়াস মর্গান পরিবারকে লন্ডনে স্থানান্তরিত করেন এবং জর্জ পিবডি অ্যান্ড কোম্পনি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ব্যাংকিং ক্ষেত্রে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে মর্গানকে সুইজারল্যান্ডের একটি ইনস্টিটিউট পাঠানো হয়। সেখানে তিনি গণিত এবং ফ্রেঞ্চ ভাষার উপর পড়াশোনা করেন। তিনি জার্মানির গোটিংগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা শুরু করেন।

প্রাথমিক ক্যারিয়ার এবং বিয়ে

১৮৫৭ সালে পড়াশোনা শেষ করে মর্গান যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে পাড়ি জমান এবং বাবার প্রতিষ্ঠান শেরম্যান অ্যান্ড কোম্পানিতে ক্লার্ক পদে চাকরি নেন। পেশাগত জীবনে তিনি উদ্ভাবনী দক্ষতার পরিচয় দেন। কেননা তখনকার সময়ে কফি ব্যবসায় তিনি নেটওয়ার্কিং দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে অনেক মুনাফা অর্জন করেন। মর্গান কফি ক্রয় করার জন্য কোম্পানির তহবিল ব্যবহার করতেন এবং পরে বিক্রি করতেন স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে। ১৮৬০ সালের প্রথম দিকে জে পিয়ারপন্ট মর্গান অ্যান্ড কোম্পনি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাবার সাথে কাজ শুরু করেন।

source: images.google.com

মর্গান সফল এক ব্যবসায়ী পরিবারের কন্যা অ্যামিলিয়া মেমি স্টুগেসের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৮৬১ সালে নববধূ অ্যামিলিয়া মেমি যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হলে মর্গান জুটি আলজিয়ার্সে স্থানান্তরিত হন যক্ষ্মা রোগ থেকে মুক্তি লাভের জন্য। কিন্তু নার্সদের সর্বোত্তম প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ১৮৬২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মর্গানকে কাঁদিয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে যান নববধূ অ্যামিলিয়া মেমি।

ভালোবাসার মানুষকে হারানো বিধ্বস্ত তরুণ এবং কাজ পাগল এই ব্যবসায়ী নিউইয়র্কে ফিরেই মনোনিবেশ করেন কাজে। ১৮৬৪ সালে বাবার অনুরোধে তিনি চার্লস ডাবনিকে পার্টনার নিযুক্ত করেন। মরগান লন্ডন ব্যাংকিং সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী হওয়ার পরেই তার আর্থিক সম্পদের অনেক উন্নতি হয় যা আমেরিকান ব্যবসায়ীদের নজর কাড়ে। পরবর্তিতে তিনি ১৮৬৫ সালে পুনরায় নিউইয়র্কের আইনজীবী কন্যা ফ্রান্সিস লুইসার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

শিল্পক্ষেত্রে মর্গান

১৮৭১ সালে অবসর গ্রহণের পর তিনি ফিলাডেলফিয়া ব্যাংকার অ্যান্থনি ড্রেক্সেলের সাথে যোগ দেন। ৩০ বছর বয়সে মর্গান ব্যাংকিং সেক্টর উন্নয়নে এমন এক কৌশল অবলম্বন করেন যা সারা বিশ্বে ব্যাপক সাড়া ফেলে। মর্গানের সফল কর্মজীবন শুরু হয় উইলিয়াম ভান্ডারবিল্টের কাছে নিউইয়র্ক সেন্ট্রাল রেলপথের ২,৫০,০০০ শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে। ১৮৭৯ সালে তিনি নিউইয়র্ক সেন্ট্রাল বোর্ডের পরিচালক হওয়ার সামর্থ্য লাভ করেন। পরের বছর তিনি উত্তর প্যাসিফিক রেলপথের উন্নয়নে প্রায় ৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি সিন্ডিকেট বিক্রি করেন যা মার্কিন ইতিহাসে বৃহত্তম রেলপথ লেনদেন ব্যবস্থাগুলোর একটি।

source: images.google.com

১৮৯০ সালে বাবার মৃত্যুর পর তার জীবনে নানা পরিবর্তন আসে। যেমন জেনারেল ইলেকট্রিক গঠন করার উদ্দেশ্যে তিনি ১৮৯২ সালে এডিসন জেনারেল ইলেকট্রিক ও থমসন-হিউস্টন কোম্পানির একত্রিকরণের মাধ্যমে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তথাপি উদ্যমশীল এই ব্যক্তির কাজগুলো তৎকালীন সারাবিশ্বের শিল্পক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছিল। ড্রেক্সেলের মৃত্যুর পর পিয়ারপন্ট আবার মর্গান অ্যান্ড কোম্পানি পুনর্নির্মাণ করেন। কোম্পানিটি ১৮৯৮ সালে ফেডারেল স্টিল গঠনের মাধ্যমে স্টিল শিল্পে বড় ভূমিকা রাখে। তিন বছর পর, প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারে অ্যান্ড্রু কার্নেগির স্টিল কোম্পানি ক্রয়ের পর, মর্গান বিলিয়ন ডলার সম্পদের মালিক হন।

এক নজরে মর্গান কর্পোরেশন

১৮৯০ সাল থেকে ১৯১৩ সাল পর্যন্ত জে পি মর্গান প্রায় ৪২টি প্রধান কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠা করেন। যার বেশির ভাগেই ছিল শিল্পক্ষেত্রে এবং রেলপথ উন্নয়নে। শিল্পক্ষেত্রে প্রধান কর্পোরেশনগুলোর মধ্যে আমেরিকান ব্রিজ কোম্পানি, ফেডারেল স্টিল কোম্পানি, অ্যাটলাস পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট কোম্পানি, ইউনাইটেড স্টেট স্টিল কর্পোরেশন, জেনারেল ইলেকট্রনিক্স অন্যতম। এছাড়াও রেলপথ উন্নয়নে নর্দান প্যাসিফিক রেলওয়ে, নিউইয়র্ক সেন্ট্রাল সিস্টেম, পেনসিলভানিয়া রেলপথ, ইরি রেলপথ, ফ্লোরিডা ইস্ট কোস্ট রেলওয়ে, আটলান্টিক কোট লাইন অন্যতম।

source: images.google.com

বিতর্কিত মর্গান

১৯০১ সালে মর্গান জেমস জে হিলের সাথে যোগ দেন এবং নর্দান সিকিউরিটিজ কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। নর্দান সিকিউরিটিজের বেশির ভাগ শেয়ার গৃহীত হতো নর্দান প্যাসিফিক থেকে। নর্দান এবং সিবি অ্যান্ড কিউ রেলপথের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ছিল মর্গানের উপর। পরবর্তীতে তিনি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি থিওডোর রোজভেল্টের বিরোধিতা করেন এবং নিজের জনপ্রিয়তার আশায় ধনী ব্যবসায়ীদের সাথেও বিরোধিতা শুরু করেন। ১৯০২ সালে বিচার বিভাগ শের্মান অ্যান্ট্রিস্ট আইনে নর্দান সিকিউরিটিজকে বিচারের আওতায় নিয়ে আসে। সুপ্রিম কোর্টে প্রায় ২ বছর এই মামলা চলার পর ১৯০৪ সালে এর নিষ্পত্তি হয়।

source: images.google.com

মর্গান তার কৃতিত্ব শিল্প এবং সরকার দুই ক্ষেত্রে সমানভাবে বজায় রাখার চেষ্টা চালিয়ে যান। ১৯০৩ সালে জে পি মরগান এবং তার কোম্পানি ৪০ মিলিয়ন ডলার অপসারণ করার কেলেঙ্কারিতে পড়ে যায়। এসব কেলেঙ্কারির কারণে ১৯০৭ সালে মর্গান পুনরায় যুক্তরাষ্ট্র সরকারের মুখোমুখি হয়।

মোট সম্পত্তি

উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে, মর্গানের মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২৫.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যার ৩০ মিলিয়ন ডলার শেয়ার নিউইয়র্ক এবং ফিলাডেলফিয়ার ব্যাংক বহন করে।

মজার তথ্য

মর্গানের মৃত্যুর পর ব্যবসার সকল দায়িত্ব গ্রহণ করেন তার পুত্র জে পি মরগান জুনিয়র। কিন্তু এত বড় রাজত্ব পাওয়ার পরও তার পুত্র বাবার মতো প্রভাবশালী হতে পারেননি। কারণ মর্গানের মৃত্যুর পর ১‍৯৩৩ সালে গ্লাস-স্টেগাল আইনে তার সকল সম্পত্তি তিনটি ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। যার একভাগ মর্গান ট্রাস্টের জন্য দান করা হয়। আরেক ভাগের সম্পত্তিকে তার দৌহিত্র হেনরি স্ট্রগিস মর্গান বিনিয়োগ ঘরে প্রতিষ্ঠা করেন। বাকি অংশ লন্ডনের মর্গান গ্রেনফেলে একটি বিদেশী নিরাপত্তা বাড়ি হিসাবে পরিচিতি লাভ করে।

source: images.google.com

মৃত্যু

ইতালির রোমে ৩১ মার্চ, ১৯১৩ সালে গ্র্যান্ড হোটেলে ঘুমের মধ্যে মারা যান জে পি মর্গান। তার মৃত্যুতে পুরো নিউইয়র্কে শোকের ছায়া নেমে আসে এবং ওয়াল স্ট্রিটের পতাকা অর্ধ নিমিত রাখা হয়। এমনকি তার লাশ নিউইয়র্ক শহরের পাশ দিয়ে যাওয়া সময় প্রায় ২ ঘন্টা স্টক মার্কেট থেকে শুরু করে শহরের প্রায় সকল কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়।

অ্যান্ড্রু কার্নেগি: মানবতার সেবায় নিয়োজিত এক অন্যরকম উদ্যোক্তার গল্প

Previous article

জর্জ ইস্টম্যান: ফটোগ্রাফি শিল্পের পথিকৃৎ

Next article

You may also like

Comments

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More in Articles